একটা সময় ছিল যখন কাগজের টাকা মানেই শুধু কাগজ না — এর পেছনে বাস্তব সম্পদ হিসেবে সোনা থাকতো। আজকে আমরা যে ডলার বা অন্যান্য মুদ্রা ব্যবহার করি, সেগুলো আসলে শুধু সরকারের উপর মানুষের বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সবসময় এমন ছিল না। বিষয়টা বুঝতে হলে একটু ইতিহাসে যেতে হবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তখন একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করার প্রয়োজন হয়। এই কারণে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি হয় যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের মুদ্রা মার্কিন ডলারের সাথে যুক্ত থাকবে এবং মার্কিন ডলার সরাসরি সোনার সাথে যুক্ত থাকবে।
সে সময় একটি নির্দিষ্ট হার নির্ধারণ করা হয়েছিল — ১ আউন্স সোনা = ৩৫ মার্কিন ডলার। (১ আউন্স প্রায় ২.৪৩ ভরি)
অর্থাৎ তাত্ত্বিকভাবে কেউ যদি ৩৫ ডলার নিয়ে মার্কিন ট্রেজারিতে যেত, তাহলে সে সেই ডলারের বদলে ১ আউন্স সোনা পেতে পারত। এই কারণেই তখন ডলারের উপর লেখা থাকতো: “Redeemable in Gold on Demand.”
এই ব্যবস্থার ফলে খুব দ্রুতই ডলার হয়ে ওঠে বিশ্বের রিজার্ভ মুদ্রা (Reserve Currency)। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ এবং বৈদেশিক লেনদেনে ডলারের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়তে থাকে।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় ১৯৬০-এর দশকে, যখন যুক্তরাষ্ট্র Vietnam War-এ জড়িয়ে পড়ে। এই যুদ্ধ চালাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছিল। সেই খরচ সামলানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রচুর পরিমাণে ডলার ছাপাতে শুরু করে।
এখানেই বড় সমস্যা তৈরি হয়। বাজারে যত ডলার ছাপানো হচ্ছিল, মার্কিন ট্রেজারিতে তত সোনা ছিল না। অর্থাৎ ডলারের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছিল কিন্তু সোনার পরিমাণ একই রয়ে গিয়েছিল।
এই বিষয়টি বুঝতে পেরে কিছু দেশ চিন্তিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ফ্রান্স ও জার্মানি তাদের কাছে থাকা ডলার যুক্তরাষ্ট্রকে ফিরিয়ে দিয়ে সোনা চাইতে শুরু করে। কারণ তাদের ভয় ছিল — যদি একসময় দেখা যায় ডলারের বিপরীতে পর্যাপ্ত সোনা নেই?
সমস্যা হলো, যদি অনেক দেশ একসাথে সোনা চাইত তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সেই সোনা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত রিজার্ভ ছিল না।
এই পরিস্থিতিতে ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট Richard Nixon একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। তিনি বলেন যে সেই দিন থেকে যুক্তরাষ্ট্র আর ডলারের বদলে সোনা দেবে না।
এই ঘটনাটিকেই বলা হয় Nixon Shock। এর মাধ্যমে কার্যত Gold Standard ব্যবস্থার সমাপ্তি ঘটে এবং পৃথিবী এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করে যেখানে মুদ্রার মূল্য আর সোনার সাথে সরাসরি যুক্ত থাকে না।
Gold Standard শেষ হওয়ার পর ডলার পুরোপুরি Fiat Currency হয়ে যায়। অর্থাৎ এমন একটি মুদ্রা যার মূল্য নির্ভর করে অর্থনীতি, সরকারের নীতি এবং মানুষের আস্থার উপর।
এরপর কয়েক বছরের মধ্যেই সোনার দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। মাত্র প্রায় ৯ বছরের মধ্যে সোনার দাম প্রায় ২৪ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
এই ইতিহাস অনেক মানুষকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। কাগজের টাকা সরকার চাইলে বেশি ছাপাতে পারে, কিন্তু সোনা একটি সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ — এটি সহজে তৈরি করা যায় না।
তাই অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে সোনা এখনো একটি Real Asset হিসেবে বিবেচিত হয়।
তাহলে প্রশ্নটা থেকেই যায় — দীর্ঘমেয়াদে আসল সম্পদ কোনটি? কাগজের টাকা, নাকি সোনা?