চন্দ্র অভিযান: নাসার 'আর্টেমিস' প্রোগ্রাম (Artemis Mission) এবং এর সর্বশেষ আপডেট
১৯৭২ সালের 'অ্যাপোলো ১৭' (Apollo 17) মিশনের পর মানুষ আর চাঁদের বুকে পা রাখেনি। দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী পর মানবজাতিকে পুনরায় পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA) যে যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তার নাম আর্টেমিস প্রোগ্রাম (Artemis Program)। গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী 'আর্টেমিস' হলেন চন্দ্রদেবী এবং অ্যাপোলোর যমজ বোন। অ্যাপোলো মিশনের ঐতিহাসিক সাফল্যের পর এবার আর্টেমিস মিশনের মাধ্যমে মহাকাশ গবেষণায় এক নতুন এবং দীর্ঘমেয়াদী যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে।
আর্টেমিস মিশনের মূল লক্ষ্য কী?
আর্টেমিস শুধু চাঁদে গিয়ে ঘুরে আসার কোনো সংক্ষিপ্ত মিশন নয়। এর উদ্দেশ্যগুলো অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী এবং বিজ্ঞানভিত্তিক:
- দীর্ঘমেয়াদী বসতি স্থাপন: চাঁদের বুকে এবং এর কক্ষপথে মানুষের দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই উপস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক পরিকাঠামো তৈরি করা।
- নতুন ইতিহাস রচনা: এই প্রোগ্রামের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো প্রথমবারের মতো কোনো নারী এবং অশ্বেতাঙ্গ নভোচারীকে চাঁদের পৃষ্ঠে পাঠানো।
- সম্পদ আহরণ: চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে (Lunar South Pole) জমে থাকা বরফ ও অন্যান্য খনিজ সম্পদের সন্ধান করা, যা ভবিষ্যতে খাওয়ার পানি এবং রকেটের জ্বালানি তৈরিতে কাজে লাগবে।
- মঙ্গল গ্রহের প্রস্তুতি: চাঁদে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা এবং নতুন উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে মানবজাতিকে মঙ্গল গ্রহে (Mars) পাঠানোর পথ সুগম করা।
আর্টেমিস মিশনের প্রধান প্রযুক্তিগত উপাদান
এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করতে নাসা এবং এর সহযোগী বাণিজ্যিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বেশ কিছু অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়েছে:
- এসএলএস রকেট (SLS - Space Launch System): এটি নাসার তৈরি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এবং বিশালাকার রকেট, যা নভোচারী এবং ভারী মহাকাশযান নিয়ে সরাসরি চাঁদের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিতে সক্ষম।
- ওরিয়ন স্পেসক্রাফট (Orion Spacecraft): এটি হলো নভোচারীদের মূল যান। এই অত্যাধুনিক ক্যাপসুলেই নভোচারীরা পৃথিবী থেকে চাঁদের কক্ষপথে যাবেন এবং মিশন শেষে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন।
- হিউম্যান ল্যান্ডিং সিস্টেম (HLS): ওরিয়ন মহাকাশযান থেকে নভোচারীদের চাঁদের পৃষ্ঠে নামানো এবং আবার কক্ষপথে ফিরিয়ে আনার জন্য ল্যান্ডার প্রয়োজন। এই কাজের জন্য স্পেসএক্স (SpaceX)-এর 'স্টারশিপ' এবং ব্লু অরিজিন (Blue Origin)-এর 'ব্লু মুন' ল্যান্ডার তৈরি করা হচ্ছে।
- লুনার গেটওয়ে (Lunar Gateway): এটি হবে চাঁদের কক্ষপথে প্রদক্ষিণরত একটি ছোট স্পেস স্টেশন। এটি মূলত একটি ট্রানজিট হাব হিসেবে কাজ করবে, যেখানে নভোচারীরা অবস্থান করতে এবং ডকিং করতে পারবেন।
আর্টেমিস মিশনের ধাপসমূহ এবং ২০২৬ সালের সর্বশেষ আপডেট
আর্টেমিস প্রোগ্রামটি ধাপে ধাপে সম্পন্ন করার জন্য সাজানো হয়েছে। তবে মহাকাশ গবেষণায় নিরাপত্তা এবং কারিগরি ত্রুটিহীনতা সবার আগে অগ্রাধিকার পায়। ২০২৬ সালের শুরুর দিকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নাসা তাদের মিশনগুলোর সময়সূচি ও পরিকল্পনায় বেশ কিছু বড় পরিবর্তন এনেছে। নিচে বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো:
১. আর্টেমিস ১ (Artemis I) - সফলভাবে সম্পন্ন
২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর এই মিশনটি সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়। এটি ছিল একটি মানবহীন পরীক্ষামূলক মিশন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল এসএলএস রকেট এবং ওরিয়ন ক্যাপসুলের কার্যক্ষমতা ও নিরাপত্তা যাচাই করা। ২৫ দিনের সফল মিশন শেষে ওরিয়ন মহাকাশযানটি চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে প্রশান্ত মহাসাগরে নিরাপদে অবতরণ করে।
২. আর্টেমিস ২ (Artemis II) - প্রথম মানববাহী ফ্লায়িং মিশন (এপ্রিল ২০২৬)
এটি হবে আর্টেমিস প্রোগ্রামের প্রথম মানববাহী মিশন। চারজন নভোচারী (তিনজন নাসার এবং একজন কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির) নিয়ে ওরিয়ন মহাকাশযানটি চাঁদের চারপাশ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসবে; তবে তারা চাঁদে অবতরণ করবেন না। মিশনটি এর আগে ২০২৫ বা ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে হওয়ার কথা থাকলেও, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রকেটের জ্বালানি পরীক্ষায় (Wet Dress Rehearsal) হিলিয়াম লিকের মতো কারিগরি সমস্যা দেখা দেয়। তাই নাসা মিশনটি পিছিয়ে এপ্রিল ২০২৬ সালের কোনো এক সময় উৎক্ষেপণের জন্য নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
৩. আর্টেমিস ৩ (Artemis III) - নতুন পরিকল্পনায় বড় রদবদল (২০২৭)
প্রাথমিক পরিকল্পনায় আর্টেমিস ৩-এর মাধ্যমেই মানুষের পুনরায় চাঁদের মাটিতে পা রাখার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে নাসা একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন (Overhaul) ঘোষণা করে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আর্টেমিস ৩ মিশনটি আর চাঁদে অবতরণ করবে না। এর বদলে ২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে এটি পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে (Low Earth Orbit) পরিচালিত হবে। এই মিশনে নভোচারীরা স্পেসএক্স এবং ব্লু অরিজিনের ল্যান্ডারগুলোর সাথে মহাকাশযানের ডকিং (Docking) পরীক্ষা করবেন এবং চাঁদে পরার জন্য তৈরি করা নতুন স্পেস স্যুটের (AxEMU) কার্যক্ষমতা যাচাই করবেন। অত্যন্ত জটিল চন্দ্রাভিযানে কোনো ধরনের ঝুঁকি না নিয়ে প্রযুক্তিগত শতভাগ নিশ্চয়তা পেতেই নাসা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
৪. আর্টেমিস ৪ (Artemis IV) - চাঁদের বুকে প্রত্যাবর্তন (২০২৮)
আর্টেমিস ৩-এর পরিকল্পনা পরিবর্তনের ফলে, এখন আর্টেমিস ৪ মিশনটি হবে চাঁদের বুকে মানুষের প্রত্যাবর্তনের প্রথম মিশন। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৮ সালে এই মিশনের মাধ্যমে নাসার নভোচারীরা দীর্ঘ ৫৬ বছর পর চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে সফলভাবে অবতরণ করবেন এবং সেখানে বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালাবেন।
উপসংহার
আর্টেমিস মিশন কেবল যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার একার অর্জন হবে না; ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি (ESA), জাপানের জাক্সা (JAXA) এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির (CSA) মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এর সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত রয়েছে। মহাকাশযান নির্মাণে স্পেসএক্স বা ব্লু অরিজিনের মতো বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সংযুক্তি এই খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে। কারিগরি জটিলতা এবং নভোচারীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার স্বার্থে মিশনগুলোর সময়সূচিতে বেশ কিছু পরিবর্তন এলেও, আর্টেমিস প্রোগ্রাম মানবজাতির মহাকাশ জয় করার সীমানাকে যে আরও এক ধাপ প্রসারিত করবে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই আমরা পুনরায় চাঁদের বুকে মানুষের পদচারণার সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে চলেছি।